Information News

শিক্ষিতদের চাকরি নেই!
Date Added: 2016-02-24

Description

 

file

একটু ভালো থাকার আশায় প্রয়োজনে ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি, জমিজমা বিক্রি করে হলেও সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পিছপা হন না এ দেশের মা-বাবারা। কিন্তু সন্তানের শিক্ষাজীবন শেষে তার ওপর যখন পুরো সংসারের ভার দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন তাঁরা, তখন দীর্ঘশ্বাস যেন আরো দীর্ঘ হয়। কারণ, চাকরি নেই; কর্মসংস্থান নেই। তাই নির্ভরতার বদলে উচ্চশিক্ষিত সন্তানটি তখন হয়ে উঠছেন আরো বড় বোঝা। বরং কম শিক্ষিত ও অশিক্ষিতরা কোনো না কোনো কাজ পাচ্ছে; আর সমাজে নিগ্রহের পাত্র হয়ে হতাশায় ডুবছেন উচ্চশিক্ষিতরা। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষ করে অধিকাংশ বেকার চাকরিতে ঢোকার ৩০ বছর বয়সসীমা পার করছেন আবেদন করে করেই। মাস্টার্স সম্পন্ন করা ছেলেমেয়েরা আবেদন করছেন এমএলএসএস পদে; কিন্তু সেখানেও ব্যর্থ হচ্ছেন তাঁরা। ৯ বছর আগে হোটেল বয়, বেকারি শ্রমিক পদে তিন হাজার মানুষের চাকরি দিতে চেয়েছিল এফবিসিসিআই। অশিক্ষিতদের কাছ থেকে আবেদন চেয়েছিল সংগঠনটি অথচ বহু বিএ-এমএ পাস আবেদন করেছিলেন। অন্যান্য পরিসংখ্যানও বলে, দেশে চাকরির বাজারে শিক্ষিতরাই রয়েছেন বেশি বেকায়দায়।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ৩৪টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করেছেন চার লাখ ১৯ হাজার ৫৮২ জন। ওই বছর ৭৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন ৬৫ হাজার ৩৬০ জন। সব মিলিয়ে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার ৩০২ জন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করলেও বছরে এ পরিমাণ চাকরির সুযোগ নেই দেশে। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে বিনিয়োগ বোর্ডে নিবন্ধিত শত ভাগ বিনিয়োগও যদি বাস্তবায়ন হয়, তাতেও মোট কর্মসংস্থান হওয়ার কথা দুই লাখ ২৬ হাজার ৪১১ জনের। আদতে নিবন্ধনের অর্ধেকও শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ হয় না। আর শিল্প-কারখানায় নিয়োগপ্রাপ্তদের ৮০ ভাগই থাকে শ্রমিক, যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকের চেয়েও কম। আবার যদি শত ভাগ বিনিয়োগ হয়েছে এবং সেখানে দুই লাখ ২৬ হাজার ৪১১ জনের প্রত্যেকেরই চাকরি হয়েছে আর চাকরিগুলো স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরাই পেয়েছেন ধরে নেওয়া হয়, তবু শুধু ওই বছর পাস করাদের মধ্যে বেকার থাকবে তিন লাখ ২৩ হাজার ৮৯১ জন, যা ৫০ শতাংশেরও বেশি।

বেসরকারি খাতের বাইরে শিক্ষিতদের চাকরি পাওয়ার আরেকটি পথই খোলা থাকে, সেটি হলো সরকারি চাকরি। কিন্তু গত বছর সরকারের সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মিলিয়ে মোট ৫০ হাজার ৪৭৩ জনের চাকরি হয়েছে।

অনলাইনে চাকরির বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান ‘বিডিজবস’-এর সিনিয়র ব্যবস্থাপক মো. শামীম হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতিদিন তাঁদের ওয়েবসাইটে এক লাখ ২০ হাজার একক গ্রাহক (একজন একাধিকবার ব্রাউজ করলেও একজন হিসাবে) চাকরি খোঁজে। চাকরিদাতাদের নজর কাড়তে সাইটটিতে রেজিস্ট্রেশন করে জীবনবৃত্তান্ত রেখে দিয়েছে ১১ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি শিক্ষিত বেকার। তিনি বলেন, রেজিস্ট্রেশন করাদের ৭০-৮০ শতাংশই একেবারে নতুন, অনার্স-মাস্টার্স শেষ করা, যাঁরা প্রথমবারের মতো চাকরি খুঁজছেন। বাকি ২০-৩০ শতাংশ চাকরিজীবী রয়েছেন, যাঁরা আরো ভালো চাকরি খুঁজছেন।

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরে সরকারি খাতে কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে মোট নিয়োগ পেয়েছে দুই লাখ ৬৬ হাজার ২৭৫ জন। এর মধ্যে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫০ হাজার ৪৭৩ জন, ২০১৩-১৪-তে ৫৯ হাজার ১৩২ জন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২৯ হাজার ৭৫২ জন, ২০১১-১২-তে ৫১ হাজার ০১৩ জন এবং ২০১০-১১ অর্থবছরে ৭৫ হাজার ৯০৫ জন। এই পাঁচ অর্থবছরে সরকারি চাকরিতে কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ৬০ হাজার ২৯২ জন। তাঁদের সবাই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করা। এই পাঁচ বছরে কর্মচারী পদে নিয়োগ পেয়েছেন দুই লাখ পাঁচ হাজার ৯৮৩ জন। এঁদের প্রায় অর্ধেক স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস করা। বাকিরা অষ্টম শ্রেণি, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা। এখনো সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে প্রায় আড়াই লাখ পদ শূন্য রয়েছে, যেখানে নিয়োগের উদ্যোগ নিলে সমপরিমাণ শিক্ষিতের বেকারত্ব ঘুচবে।

সাবেক সংস্থাপন (বর্তমানে জনপ্রশাসন) সচিব ড. মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, শিক্ষিতদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারার পেছনে প্রথম ব্যর্থতা হলো—আমাদের কোনো হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমেন্ট নেই। এটা না থাকার কারণে যখন যা তদবির হচ্ছে, তখন তা নিয়োগ হচ্ছে। সরকারের টোটাল সিস্টেম হচ্ছে সাময়িক। শূন্য পদ পূরণে নীতিমালা নেই। শূন্য পদ পূরণ হলেও ঠিকমতো হয় না; সময়মতোও হয় না। জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর নিয়োগ দিতে দেরি হয়ে যায়। এরপর নিয়োগ হলেও কিছু পদ শূন্য থেকে যায়। ১৯৮২ সালের পর জনপ্রশাসন নিয়ে অর্গানাইজড কোনো স্টাডি হয়নি। সময় এসেছে একটি কমিশন করে এসব বিষয় নিয়ে স্টাডি করার। এক সময় এসব গবেষণার জন্য টাকা একটা বড় সমস্যা ছিল। এখন দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছে। তাই এসব বিষয়ে এখন টাকা আর কোনো সমস্যা নয়। এখন দরকার আন্তরিকতা।

বেসরকারি খাত দেশের সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের জোগানদাতা। কিন্তু দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, বেসরকারি খাত সে হারে সম্প্রসারিত হচ্ছে না। প্রতিবছর গড়ে ২০ লাখেরও বেশি মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে চাকরির খোঁজে। এর মধ্যে সাড়ে পাঁচ লাখ উচ্চশিক্ষিত। বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগে বিনিয়োগ বোর্ডে নিবন্ধন করতে হয়। সেখানে নিবন্ধনের সময়ই উল্লেখ করতে হয় যে, বিনিয়োগ হলে ওই প্রতিষ্ঠানে মোট কতজন মানুষের চাকরি হবে। ২০১০-২০১১ অর্থবছর থেকে গত ২০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে বিনিয়োগ বোর্ডের নিবন্ধন তথ্যানুযায়ী মোট কর্মসংস্থান হওয়ার কথা ১৭ লাখ ১৫ হাজার ৮৪০ জনের। কিন্তু এই বিনিয়োগের কত অংশ বাস্তবায়ন হয়, তার কোনো তথ্য সরকারি-বেসরকারি কোনো সংস্থার কাছে নেই। তবে অর্থনীতিবিদদের ধারণা, নিবন্ধনের অর্ধেকেরও কম বিনিয়োগ হয়। তাতে বড়জোড় চাকরির সুযোগ হয়েছে আট-দশ লাখ মানুষের।

দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বেসরকারি খাতে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবল দরকার। আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষিতদের সে জ্ঞান নেই। ফলে তাঁরা চাকরি পাচ্ছেন না। উচ্চ শিক্ষিতদের বেকারত্বের কারণে সমাজে ও রাষ্ট্রে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।

আবদুল মাতলুব বলেন, বেসরকারি খাতে অফিশিয়াল কাজে কিছু কর্মকর্তা থাকেন, যাঁদের করিগরি জ্ঞান না থাকলেও চলে। তবে এঁদের সংখ্যা খুবই কম। সাধারণত, বেসরকারি কারখানায় শ্রমিক ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের দরকার হয় ৭০ শতাংশ। বাকি ৩০ শতাংশ সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও হয়। কিন্তু বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিতদের ৯০ শতাংশই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত, যার সঙ্গে শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার কোনো সম্পর্ক থাকে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ প্রতিবেদন ২০১৩ অনুযায়ী, সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টা কাজ করেছেন, ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে এমন কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা পাঁচ কোটি ৮০ লাখ ৭৩ হাজার। এর মধ্যে মাত্র ৬.১ শতাংশ বা ৩৫ লাখ ২৯ হাজার কর্মজীবী স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস করা। ৭৪ লাখ ৩৭ হাজার উচ্চ মাধ্যমিক, এক কোটি ৭৭ লাখ ৮১ হাজার মাধ্যমিক ও এক কোটি ৬৬ লাখ ৭৯ হাজার প্রাথমিক স্তর সম্পন্ন করা। বাকি এক কোটি ২৩ লাখ ৯০ হাজার কর্মজীবীর কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই।

২০১৫ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে শহুরে যুবদের ৩৬ শতাংশ এবং পল্লী যুবদের ৪২ শতাংশ কোনো শিক্ষা, চাকরি কিংবা প্রশিক্ষণ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। অর্থাৎ, তারা পুরোপুরি বেকার।

২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে দ্য ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু স্নাতক বেকারের সংখ্যা ৪৭ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আফগানিস্তান ছাড়া আর কোনো দেশে এত বেশি উচ্চশিক্ষিত বেকার নেই। তাদের হিসাবে, আফগানিস্তানে এ হার ৬৫ শতাংশ। ভারতে ৩৩, নেপালে ২০, পাকিস্তানে ২৮ ও শ্রীলঙ্কায় ৭.৮ শতাংশ। বেকারদের মধ্যে কলা ও মানবিক বিষয়ে অধ্যয়নকারী উচ্চশিক্ষিতরাই বেশি। বাংলাদেশে ভালো চাকরির আশায় প্রতিবছরই উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু তাদের কর্মক্ষেত্র বাড়ছে না। ২০০৪ সালে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল আট লাখ ২১ হাজার ৩৬৪ জন। আর ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ আট হাজার ৩৩৭ জনে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ এখন ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে কারিগরি জ্ঞানের অভাব থাকায় তাঁরা চাকরি পাচ্ছেন না। এ কারণেই বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি। এঁদের বেকার থাকার আরেকটি কারণ হলো, সমাজে যে ধরনের কাজ পাওয়া যায়, উচ্চশিক্ষিতরা সে ধরনের কাজ করতে আগ্রহী নন। কিন্তু তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী চাকরির ক্ষেত্রও কম। আর তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী চাকরির জন্য যে ধরনের কারিগরি জ্ঞান দরকার, তা তাঁদের নেই। পাশাপাশি, দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যে হারে বাড়ছে, সে হারে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়াটাও এর একটি বড় কারণ।

Share on FacebookTweet about this on TwitterShare on Google+Share on LinkedInShare on StumbleUponPin on Pinterest

আপনার মতামত লিখুন

 

Share on Facebook Share on Twitter

 

Upload Your Resume

Posting CVs on Eurojobs.com is completely FREE. You can manage all your applications and vacancies from within your account.

Upload Your Resume

Find Job Now

We connect you to the employer you deserve - all over the world through online events, face-to-face summitsand dedicated recruiting projects.

Find A Job Now